আজ ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কেমন আছেন সাতক্ষীরার ইত্যাদি খ্যাত চুল দিয়ে গাড়ি টানা যুবক আব্দুস সবুর

মোঃ শাহিনুর রহমান শাহিন, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:

বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি তে প্রচারিত মাথার চুল দিয়ে মাইক্রোবাস টানা যুবক আব্দুস সবুর ওরফে (ডিনা) বর্তমানে কেমন আছেন
সে সময়ে সারাদেশে আলোচনায় এসেছিলেন সাতক্ষীরা জেলার এই কৃতি সন্তান। তৎকালীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এই আব্দুস সবুরকে দীর্ঘ দিন পর হয়তো সবাই ভুলেই গেছেন।
অনেকেই জানেন না বর্তমানে কি অবস্থায় আছেন সেই আব্দুস সবুর? সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বর্তমানে চিকিৎসার অভাবে পাগলের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এই আব্দুস সবুর। ১৯৯৬ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় তার বিশেষ কর্মের জন্য ডাকা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন এর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ইত্যাদির অনুষ্ঠানে।
ইত্যাদি অনুষ্ঠানে সে মাথার চুল দিয়ে অনায়াসে এক সাথে ৪টি মাইক্রোবাস টেনে নিয়ে সকলের মন জয় করেছিলেন।
কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!
বিশ্ব রেকর্ড গড়া বিখ্যাত এই আব্দুস সবুর তার কৃতিত্ব দিয়ে সকলের মন জয় করলেও জীবনের বাস্তবতার কাছে হার মেনে মেধাবী এই ছাত্র বিশেষ কৃতিত্বমান আব্দুস সবুর ব্রেনের সমস্যায় অতীত ভুলে বর্তমানে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন।আব্দুস সবুর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের বল্লী গ্রামের মৃত আব্দুল কুদ্দুসের বড় পুত্র। আব্দুস সবুর বল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বল্লী মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি দিয়ে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশুনার পাশাপাশি তখন তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন,
এবং লিখতে থাকেন গান কবিতা ও নাটক।
তিনি একটি নাটকের বই ও লিখে ফেলেন
তার প্রকাশিত নাটকের বই এর নাম
“রঙ্গ রসের পাপ কর্ম”
ইহাতে ৪টি নাটক আছে যথা…
১/ঘোড়ার ডিম
২/পাপ কর্ম
৩/হিমাঁচলের বাণিজ্য এবং
৪/গান ও জ্ঞান
আব্দুস সবুরের ছোট বোন সেলিনা আক্তার জানান শৈশবে আমার ভাই অত্যান্ত মেধাবী ছিলেন , তিনি ছোটবেলা থেকেই সবসময় সকলের থেকে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করতেন।
স্কুলে সবার সেরা ছিল সে।
আব্দুস সবুর মার্শাল আট ও শিখতেন। রেখেছিলেন মাথায় অনেক লম্বা চুল ও মুখে লম্বা দাড়ি। তার দাড়িতে তিন-চার জন বাচ্চা ঝুলিয়ে রাখতে পারতো,
তার বিমাতা ভাই মানুন এপ্রসঙ্গে জানান আমাদের বাড়ির সামনের এই পুকুর ধারে দাড়িয়ে ভাই তার দাড়িতে কয়েকটা বাচ্চা কে ঝুলিয়ে রেখে মাথা ঝাঁকিয়ে তাদের কে পুকুরের পানিতে ফেলে দিত। এভাবে নানা কারিশমা দেখিয়ে অনান্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে পরবর্তীতে ভাই
দীর্ঘদিন মাথার চুল দিয়ে মাইক্রো-প্রাইভেটকার টেনে নিয়ে যাওয়ার চর্চা করতে থাকে।
এক পর্যায়ে চুল দিয়ে গাড়ি টানার কাজে সফল ও সে হয়।১৯৯৬ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে তার এই কর্ম প্রতিভার জন্য ইত্যাদি অনুষ্ঠান পরিচালক হানিফ সংকেত এর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি তে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান। আব্দুস সবুরের মাথার চুল দিয়ে এক সাথে ৪টি মাইক্রোবাস টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ইত্যাদিতে দেখানো হয়।
আমরা দেশবাসী সে অনুষ্ঠান দেখে আব্দুস সবুর কে বাহ্বা দিয়েছিলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বর্ষের পরীক্ষা দেওয়ার কিছুদিন পরেই এই কৃতিত্বমান যুবক আব্দুস সবুরের মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। সেই থেকে আব্দুস সবুর বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সে ব্রেনের সমস্যায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায় । আব্দুস সবুরের বোন সেলিনা আক্তার আরো জানান, ‘আর্থিক সমস্যার কারণে আমার ভাইকে চিকিৎসা করাতে পারছিনা।
২০০১ সালে আমার চাচারা আমার ভাইকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করার জন্য নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তাররা বলে, মাথার চুল দিয়ে গাড়ি টানার ফলে সবুরের ঘাড়ের একটা শিরা পাম্পের মতো হয়ে গেছে। ওই শিরা ছিঁড়ে গেলে হয়তো বাঁচানো যেত না। শিরাটা ফাঁকা হওয়ার ফলে তার মস্তিস্কে এই সমস্যা হয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসা করালে আবার সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। সেই সময় তাকে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় চিকিৎসকরা। বাড়ি আসার পর কিছুদিন আমার ভাই সুস্থ্য থাকে। পরবর্তীতে আর্থিক সমস্যার কারণে ভাইকে আর পাবনায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি বা চিকিৎসা করানো হয়ে উঠিনি। কিছুদিন পরে আমার ভাই এর ব্রেনে সমস্যা দেখা দেয়।
আব্দুস সবুরের ব্রেনে সমস্যা হওয়ার ঘটনা ইত্যাদি টিমের কেউ জানেন কিনা এ বিষয়ে আব্দুস সবুরের বোন বলেন, আমরা গ্রামের মানুষ তাদের সাথে কখনো যোগাযোগ করিনি। আপনাদের মাধ্যমে যদি ইত্যাদি’র লোকজন অথবা সরকার খবর পেয়ে আমার ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তাহলে আমার ভাই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। আব্দুস সবুরের বোন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে তার ভাইয়ের চিকিৎসা-ভার গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছেন কৃতিত্বমান এই যুবক আমাদের গর্ব। শুধু আমাদের সাতক্ষীরাবাসীর নয় তিনি সারা বাংলাদেশের গর্ব। তাই পিতৃমাতৃহীন এই যুবক আব্দুস সবুরের চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য দেশবাসীর সু দৃষ্টি কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর