আজ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

দেবহাটায় লকডাউনেও বন্ধ নেই এনজিও’র কিস্তি আদায়, বিপাকে নিন্ম আয়ের মানুষেরা

মাহমুদুল হাসান শাওন, দেবহাটা: সাতক্ষীরার দেবহাটায় বিভিন্ন এনজিওকর্মীরা লকডাউনের মধ্যে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কিস্তি আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন নিন্ম আয়ের ঋণগ্রহীতারা। ঋণের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ছোটখাটো বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসার কার্যক্রম চালান। এ ছাড়াও অনেকে এনজিও থেকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ নিয়ে ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার, ভ্যান, মোটরভ্যান, আলমসাধুসহ বিভিন্ন যানবাহন কিনে চালিয়ে তা থেকে আয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন ও ঋণের কিস্তি দেন।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বাড়তে থাকায় সরকার দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করে। একইসাথে সীমান্ত এলাকা হওয়ায় ঝুকিপূর্ন সাতক্ষীরাতে আঞ্চলিক ভিত্তিতে কঠোর লকডাউন ঘোষনা করে জেলা প্রশাসন। জেলাব্যাপী তৃতীয় মেয়াদে বর্ধিত এ লকডাউনের সময়সীমা রয়েছে ২৪জুন রাত ১২টা পর্যন্ত। তবে যে হারে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় করোনা সংক্রমন ছড়াচ্ছে তাতে করে ২৪ জুনের পরও চলমান লকডাউন অব্যহত রাখার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘদিন চলমান লকডাউনের কারনে জেলার বেশিরভাগ মানুষ কর্মহারা হয়ে বর্তমানে অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসা বানিজ্য ও দৈনন্দিন আয় রোজগার। এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবার পরিজনদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দিতে হিমশিম খাওয়া নিন্ম আয়ের মানুষেরা এনজিওর ঋণের কিস্তি দিতে গিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।
দেবহাটা উপজেলাতে ঋন কার্যক্রম পরিচালিত বেসরকারী এনজিও গুলোর মধ্যে আইডিয়াল, আশা, ব্র্যাক, নওয়াবেকী গনমুখী ফাউন্ডেশন, টিএমএসএস, ব্যুরো বাংলাদেশ ইত্যাদি বর্তমানে সর্বোচ্চ মাত্রায় ঋন কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়মিত কিস্তি আদায় করছে। এছাড়া সমাজসেবা ও সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা আরো শতাধিক ছোট-বড় এনজিও বেআইনীভাবে করোনাকালেও লকডাউন উপেক্ষা করে চড়া সুদের ঋনের কিস্তি আদায়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু বেসরকারী নয়, রয়েছে পল্লী দারিদ্র বিমোচন ও আমার বাড়ি আমার খামারের মতো সরকারী একাধিক প্রকল্প থেকেও নিয়মিত কিস্তি আদায় অব্যহত রয়েছে।
গত ১০জুন লকডাউন চলাকালীন ক্ষুদ্র ঋনের কিস্তি আদায় না করার জন্য নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে এনজিও কতৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। অথচ জেলা প্রশাসকের সেই অনুরোধকে দূর্বলতা ভেবে তা মানছেনা এসব এনজিও গুলো। এমনকি জেলা প্রশাসনের আরোপিত বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে প্রতিদিন সকাল থেকে দেবহাটা উপজেলার প্রত্যেকটি অলিগলির বাড়িবাড়ি গিয়ে দেদারছে কিস্তি আদায় করে চলেছে এনজিওর মাঠকর্মীরা। কোনো কোনো এনজিওর কর্মী এক বাড়িতে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে পাড়ার সব নারী ঋণ গ্রহীতাদের নিকট থেকে কিস্তি আদায় করছেন। এ সময় নারী ঋন গ্রহীতাদের মাঝে মাস্ক ব্যবহার বা সামাজিক দূরত্ব মানার কোনো বালাই থাকছে না। আর এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি ঘুরে বেড়ানোয় ঋন গ্রহীতা পরিবার গুলোর পাশাপাশি এসব এনজিওর কর্মীরাও মহামারী করোনা সংক্রমন ছড়ানোর তীব্র ঝুঁকিতে অবস্থান করছেন।
করোনার এমন দূঃসময়ে উপজেলার ভুক্তভোগী খেটেখাওয়া ঋণগ্রহীতারা যখন তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এরই মধ্যে এসব এনজিওকর্মীরা বাড়ি বাড়ি কিস্তি আদায়ের জন্য ধরনা দিচ্ছেন, চাপ সৃষ্টি করে কিস্তি আদায় করছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
উপজেলার সখিপুরের আজিজুল হক, পারুলিয়ার রবিউল ইসলাম, কুলিয়ার রুহুল আমিন সহ একাধিক ভুক্তভোগী ঋন গ্রহীতারা বলেন, আমরা বেসরকারি আশা, আইডিয়াল, ব্র্যাক, পল্লী দারিদ্র বিমোচনসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে ঋন নিয়ে ব্যবসা ও ছোটখাটো গাড়ি কিনে তা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহসহ ঋনের কিস্তি দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে লকডাউনে ব্যবসা বানিজ্য প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি। লকডাউনে কয়েক সপ্তাহ বাড়ি বসে আছি, কোনো আয়-রোজগার নেই। ধারদেনা করে সংসার চলছে, কিস্তি কিভাবে দেব ভেবে পাচ্ছি না। লকডাউনের সময় কিস্তি বন্ধ না করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।
কিস্তি আদায় বিষয়ে উপজেলা এনজিও সমন্বয় গ্রুপের সভাপতি আইডিয়াল পরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের ফেসবুক থেকে দেয়া ঋন আদায় না করা সংক্রান্ত পোষ্টটি দশ দিনেও আমরা দেখিনি। তাছাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারও আমাদের এধরনের কোন নির্দেশ দেননি। ইউএনও অফিস থেকে শুধু করোনাকালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে সহযোগীতা করতে বলা হয়েছে। তবে আমাদের এনজিও নিয়ন্ত্রনকারী সংগঠন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটারী অথরিটি (এমআরএ) থেকে করোনাকালে জোরপূর্বক  ঋনের কিস্তি আদায় না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারপরও যারা স্বেচ্ছায় কিস্তি দিতে ইচ্ছুক তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছি।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তার বলেন, লকডাউনে কিস্তি আদায় না করার জন্য ফেসবুকে জেলা প্রশাসকের দেয়া পোস্টের পর এনজিও গুলোর সাথে আমি কথা বলেছি। কিস্তি আদায় বন্ধ রাখতে বলা হলেও তারা গোপনে কিস্তি আদায় করছে। এব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর