আজ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

স্বপ্নের ঠিকানায় শুভংকরের ফাঁকি

  রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল—

মাথার উপর খোলা আকাশ অথবা এত বড় পৃথিবীতে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। মেঘ,বৃষ্টি ও রোদের সাথে যাদের নিত্য দিনের খেলা তাদেরকে একটা ঠিকানা করে দেওয়াটাই  ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্ন। আর এই স্বপ্ন থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রচেষ্টায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জন ভূমিহীনকে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি করে ঘর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে ঘর ছিল স্বপ্ন সেই ঘরই সমাজের আশ্রয়হীন মানুষ গুলোর কাছে স্বপ্নের ঠিকানা। 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশে নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর হস্তান্তরের কয়েকদিন পর এবং কিছু কিছু ঘর হস্তান্তরের আগেই ভেঙে পড়েছে। আমাদের কাছে এটা ঘর ভেঙ্গে পড়া হলেও আশ্রয়হীন  ঐ মানুষ গুলোর ভেঙ্গে গেছে স্বপ্ন ; ভেঙ্গে গেছে স্বপ্নের ঠিকানা। 
এসব ঘর নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভেঙে পড়ছে বলে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভূমিহীনদের ৩০০ ঘর ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বাকি গুলোর কি অবস্থা তা রাব্বুল আলামিনই ভালো জানেন।
এ পর্যন্ত আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জন ভূমিহীনকে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি করে ঘর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও বন্যাসহ নানা কারণে এখন পর্যন্ত ৩০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব হোসেন।
৩৬টি উপজেলায় ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ এবং অনিয়ম হওয়ায় ২২ জেলার প্রশাসক তদন্ত কমিটি করেছেন। সেই সঙ্গে সবগুলো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিদর্শন টিমের সদস্যরা।
তাদের রিপোর্টে ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং অবহেলার চিত্র উঠে এসেছে। ওই রিপোর্টে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, বরগুনার আমতলী, বগুড়ার শেরপুর, শাজাহানপুর, হবিগঞ্জের মাধবপুর, সুনামগঞ্জের শাল্লা ও মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলায় ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়ম, অবহেলা এবং দুর্নীতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এ জন্য ওএসডি হয়েছেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম, বরগুনার আমতলীর ইউএনও আসাদুজ্জামান, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সাবেক ইউএনও লিয়াকত আলী সেখ, মুন্সীগঞ্জ সদরের সাবেক ইউএনও রুবায়েত হায়াত শিপলু, বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সাবেক ইউএনও মাহমুদা পারভীন, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সাবেক ইউএনও তাসনুভা নাশতারান, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ইউএনও আল-মুক্তাদির হোসেন ও মুন্সীগঞ্জ সদরে কর্মরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ মেজবাহ-উল-সাবেরিন।
ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণে অনিয়ম করার ঘটনার সঙ্গে ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আলোচিত সাত উপজেলা ছাড়াও ২০১৭-১৮ অর্থবছরসহ বিভিন্ন সময়ে ২৯টি উপজেলায় ঘর নির্মাণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এই উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বগুড়ার আদমদীঘি, খাগড়াছড়ির মহালছড়ি, মাদারীপুরের কালকিনি, লালমনিরহাট সদর, গাজীপুরের শ্রীপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী, জামালপুরের ইসলামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ময়মনসিংহ সদর, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, চুনারুঘাট, ভোলার লালমোহন, পাবনার সাঁথিয়া, মানিকগঞ্জের ঘিওর, নাটোর সদর, কুড়িগ্রামের রৌমারী, কুমিল্লার দেবিদ্বার, বরিশাল সদর এবং ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর।
মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের সব ভূমিহীন ও গৃহহীনের জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হলেন ইউএনও। অন্য ৪ সদস্য হলেন- সহকারী কমিশনার (ভূমি), এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী, সংশ্নিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। অর্থাৎ ঘর নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তাদের সার্বিক দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। এ জন্য সংশ্নিষ্ট উপজেলা গুলোর ইউএনও এবং অন্য ৩ কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪৪ জন কর্মকর্তা এবং ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান রয়েছেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘর নির্মাণের বেলায় নীতিমালা মানা হয়নি। ওইসব ক্ষেত্রে অনেক ঘরে নির্মাণ ত্রুটি রয়েছে। গুণগত মানও ঠিক হয়নি। ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। পিলার ভেঙে গেছে। দেয়াল ধসে পড়েছে। ঘর নির্মাণে ব্যবহূত মালামালও ছিল নিম্নমানের। নিচু এলাকায় ঘর নির্মাণ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আবার ভূমির মালিকরাও ঘর বরাদ্দ পেয়েছে। সব মিলিয়ে ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ নিয়ে কয়েকটি উপজেলায় নীতিমালাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ঘটনা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।আশ্রয়ণ- ২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা দেশের ৮ বিভাগে সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো দেখবেন। তিনি নিজেও পরিদর্শন কার্যক্রমে অংশ নেবেন।বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়,আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও অবহেলায় জড়িত কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে দু’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। ওএসডি হয়েছেন ৮ কর্মকর্তা।সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন আর আশ্রয়হীনদের স্বপ্নের ঠিকানা আবার হয়তো জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করা হবে।  কিছু ব্যক্তি শাস্তির আওতায় আসবে সামরিক।  আবার হয়তো তারা কোন এক শুভংকরের ফাঁক ফোকড় দিয়ে বেরিয়েও যাবেন। কিন্তু যে শুভংকরের ফাঁকি স্বপ্নের ঠিকানায় দেয়া হলো তার ভুক্তভোগী হবে এই আশ্রয়হীন মানুষগুলো। হাতেনাতে হয়তো বা এগুলো ধরা তাৎক্ষণিক পড়েছে বাকি গুলো হয়তো আমার নজরেই আসতে দেয়া হবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে  সবিনয় অনুরোধ জানাবো আপনিতো আশ্রয়হীন মানুষ গুলোর জন্য আপনার স্বপ্নের ঘর বানাতে টাকাতো কম দেন নাই, আপনার সহযোগিতার কমতি ছিল না। তাহলে একবার ভেবে দেখুন আপনার স্বপ্নের ঘরে যদি এ ধরনের শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয় তাহলে সাধারণ মানুষের হয়তো স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর