আজ ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৯ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

অসমাপ্ত স্বর্ণা

রাবিদ চঞ্চলঃ-

বছর তেইশ হবে আমি তখন হাই স্কুলের ছাত্র। পড়া লেখা যতটা না মন দিয়ে করতাম তার চেয়ে ঢের বেশি দুষ্টমি, খেলাধূলা,সাইকেল চালানোতে মনোযোগী ছিলাম। স্কুলে যেতে বেশ অনিহাই ছিল বেশি, কারনে অকারণে স্কুল না যাওয়ার বাহানা ছিল মূখ্য। গ্রামের বাড়ি,না হয় দাদুর বাড়ি,না হয় খালার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতাম সব সময়। এমননি সুযোগ পেলাম সেবার। আম্মা হঠাৎ একদিন সকালে বললো ছোট আম্মুর (ছোট খালাকে ছোট আম্মু আর খালুকে ছোট আব্বু বলে সম্মোধন করি ) বাসায় যেতে হবে বেশ কয়েদিনের জন্য। ছোট আব্বু চাকরির সুবাদে ছোট আম্মুরা পরিবার নিয়ে থাকে সাতক্ষীরায়। সাতক্ষীরার মুনজিতপুরে তারা একটা ভাড়া বাসায় থাকতো। যাই হোক আম্মু বলেছে আজই যেতে হবে,কি কারন জানি না? আমিও কোন কথা না বলে রেডি হয়ে মায়ের সাথে চললাম ছোট আম্মুর বাসায়। পৌঁছে শুনলাম আমার ভাই বা বোন হবে সেদিনই সিজার অপারেশন করা হলো। আমাদের ভাই বোনের দল টা আরেকটু বড় হলো, ঘর আলো করে এলো ছোট্ট একটা বোন, সবাই বেশ খুশি চাঁদ মাখা মুখখানি দেখে দাদুভাই নাম রাখলেন স্বর্ণা। জন্মের পরেই স্বর্ণার কি যেন অসুখ দেখা দিয়েছিল আজ তা মনে নেই তবে বেশ কিছু দিন তাকে সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করে রাখা হয়েছিলো। অন্য দিকে ছোট আম্মু ছিল তখন ফুড অফিসের মোড়ে ফজল ডাক্তারের ক্লিনিকে। একটু বলে রাখা ভালো আজকের সাতক্ষীরা আর সেদিনের সাতক্ষীরার মাঝে অসম্ভব এক পরিবর্তন। শিশু হাসপাতালের মাঝে বেশ খানিকটা বাগান ছিল, বিকেল হতেই কিছু বেওয়ারিশ কুকুর বড্ড পাইচারী করতে মাঝে মধ্যে তেড়ে আসতো তবে কামড় দিতো না। আমার বেলায়ও কয়েক বার করেছে এমনি। আম্মু আর নানি আপা পালা করে স্বর্ণার দেখভাল করতো। আমার ডিউটি ছিল ক্লিনিক আর হাসপাতালে তিন বেলা ভাত পানি পৌছে দেয়া। ছোট্ট আব্বুর একখানা সাইকেল ছিল আমি তাতে চড়ে টিফিন বাটি আর গরম পানির ফ্লাক্স নিয়ে আমার ডিউটি করতাম। এভাবে বেশ কিছু দিন যাওয়ার পর ছোট আম্মু স্বর্ণা দুজনই আল্লাহ রহমতে সুস্থ হয়ে গেলে আমরা বাড়ি চলে আসি। অবশ্য মাঝে মধ্যে আম্মু – আব্বুর সাথে যেতাম ছোট আম্মু বাসায়। পুচকে স্বর্ণা ততদিনে গুড়গুড় করে বড় হচ্ছে। এরকিছু কাল পরে ছোট আব্বু বদলি হয়ে স্বপরিবারে আসে আমাদের পাইকগাছায়। সেই থেকে এবেলা নিজের বাসাতে ওবেলা ছোট আম্মুর বাসায় এভাবেই কেটে যায় দিন থেকে মাস,মাস থেকে বছর। ততদিনে স্বর্ণা হাটতে, বলতে শিখে গেছে। আমাকে দাদাভাই বলে ডাকতো তবে সেটা শুনাতো দাডা ভাই, আমার আম্মুকে বলতো বমমু, আমার আব্বুকে বলতো বববু,বোন আখীকে বলতো বডডি এমন সব অখন্ড উচ্চারণ আমাদের সবাইকে বিমোহিত করতো। ছোট আম্মুরা অনেক বছর ছিল পাইকগাছায়। ওরা চলে যাওয়ার কিছু কাল আগে আমাদের নতুন বাড়ির কাজ শুরু হয় সেই সময় স্বর্ণা আমার আম্মুকে বলেছিল বমমু এই বাড়িটা আমার তাই না? সত্যিই আম্মু ওর কথা মত ঐ বাড়ির নাম রাখে স্বর্ণা কুঠির। আমাদের বাড়ি গেটে পাথর খুদায় করে লেখা “স্বর্ণা কুঠির”। এমনি হাজারো স্মৃতি বিজড়িত ছিল আমাদের সাথে ছোট আম্মুর পরিবারের কয়েক বছর। লক্ষী প্রকৃতির মেয়ে ছিল স্বর্ণা। যাইহোক একসময় ছোট আব্বু বদলির সুবাদে তারা চলে আসে আশাশুনি দাদুর বাড়ি তারপর সাতক্ষীরা শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি করে মধুমোল্ল্যার ডাঙ্গীতে। এরমধ্যে আমি স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর কর্মজীবনে। সেই বছর গুলোতে আগের মত দেখা স্বাক্ষাত না হলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় কথা বার্তা হতো বিরতি দিয়ে। সেদিনের স্বর্ণা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। অসম্ভব মেধাবী মেয়ে, এক কথায় অতি মেধাবী। যেকোনো বিষয়ে তার জানার কৌতূহল ছিল অবাক করার মত। ইংরেজি মিডিয়ামের স্টুডেন্ট না হয়েও ইংরেজি এত জানা যায় তা আমি ওকে না দেখলে বিশ্বাসু করতে পারতাম না। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পড়শুনা করছিল সুমাইয়া মেহজাবিন স্বর্ণা।

কোভিট পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক দিন বাড়িতে আছে স্বর্ণা,কয়েকমাস আগে আমার সাথে ওর একবার দেখা হয়েছিল আমাদের দাদু বাড়িতে,শুনছিলাম কিভাবে সময় যাচ্ছে বাসায় বসে। ওর উত্তর শুনে আমিতো একে বারে “থ” বই পড়ে আর ৭-৮ টা বিড়াল আর খান চার কুকুরের দেখভাল আর মাঝে মধ্যে বাইক চালিয়ে সময় যাচ্ছে ওর। সুমিষ্ট মৃদুস্বরে নিজের সম্পর্কে ওর বক্তব্য গুলো দিয়ে আমার কাছ থেকে চলে গেল। যতদূর মনে পড়ে এটাই আমার আদরে ছোট্ট বুনডির সাথে আমার শেষ দেখা ও কথা। দোয়া করতাম সব সময় ভালো কিছু করুক। আগে কয়েক দিন আমাকে বলেছে বার এট ল করতে চায়। তার এমন চাওয়াকে আমাদের সকলের পক্ষ থেকে ছিল সাধুবাদ।

কিন্তু সব চাওয়ার শেষ যে এভাবে হবে তা কোন ভাবতেও পারিনি। গত ২০ অক্টোবর ২০২১ সকালে উঠে বারান্দায় বসে মোড়ামুড়ি করছি ঘড়ির কাটা তখন সাড়ে ৯টা ছুঁই ছুঁই হঠাৎ সাতক্ষীরা থেকে রাশেদ কাকুর একটা ফোন আমার সমস্ত পৃথিবী টাকে ওলোট পালোট করে দিল। রাশেদ কাকু তুমি ফোন দিয়ে কেন বললে না সব ঠিক আছে। তুমি কেন বললে স্বর্ণা নেই। কিভাবে কতক্ষনে সাতক্ষীরা পৌছে ছিলাম জানি না। সদর হাসপাতালে সিড়ির নিচে রাখা স্ট্রেচারের উপর নীরব নিথর একখানা দেহ, একটা কাপড়ে ঢাকা একটা লাশ। আমি চিৎকার করতে চেয়েও করতে পারিনি চিৎকার। কাপড় সরিয়ে তোর মুখ খানা দেখার মত সাহস আমি পাইনিরে। পরে অবশ্য মনে মাঝে সব চোখের পানি সিন্ধুক বন্দী করে তোর মলিন মুখ খানি দেখেছিলাম। কোন দিন তোকে এভাবে দেখবো, তোর প্রান শূন্য লাশবাহী স্ট্রেচার আমাকে টানতে হবে এ আমার কল্পনা শক্তির অনেক উর্দ্ধে ছিলোরে। প্রকৃতির ডাকে সবাই যাবে যাবে এটাই নিয়ম কিন্তু এভাবে,বড্ড অসময়ে তুই আমাদেরকে ছেড়ে গেলিরে। কি অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ নিয়ে চলে গেল স্বর্ণা তাও জানতে পারলাম না। পৃথিবীর অনেক কিছু রহস্যময় থেকে যায়। স্বর্নার চলে যাওয়াও কি থেকে যাবে এই রহস্যময়তার জালে।

সব প্রক্রিয়া শেষ করে রাতে তোকে দাফন করার সময়টা আমাকে পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের কবর কবিতার সেই লাইনটা বড় বেশি মনে পড়ছিল -” নিজ হাতে সোনার প্রতিমারে দিলাম গাড়ি “.তেইশ বছর আগের আমাদের মাঝে জন্ম নেওয়া ছোট্ট সেই মুখখানা আজ শত মন মাটি বুকে নিয়ে কি করে থাকবে এটা। বার বার মনে হচ্ছিল সেই তুই কি এই তুই যাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছি। তোর ছোট্ট বাবাও (আমার ছেলে) আজ তোকে বিদায় দিতে এসেছিল,তোকে জানালো চির বিদায়। ওর স্মৃতিতে তোর মুখ খানা একদিন হয়তো ধূসর বিষন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ভগ্নহৃদয় ক্যানভাসে তুইতো অসমাপ্ত থেকে গেলিরে। তোকে রেখে এলাম একা আজ দুদিন হলো- এই দুদিন তোর মুখ খানা একটি বারও ভুলতে পারিনি। আমৃত্য কোন দিনও পারবো নারে। বাপ-ছেলেতে জায়নামাজে বসে আল্লাহ কাছে চাইছি – হে আল্লাহ তুমি স্বর্ণাকে মাফ করে দাও,তুমি তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে নসীব করো হে দয়াময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর